স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম

গৌরবের ৫০ বছর / স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম

স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামঃ ৪৭ থেকে ৭১

ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবদী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যূদয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ২৪ বছরের এই আন্দোলন-সংগ্রামে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যোগ হয় গণতন্ত্র, শোষণ-বৈষম্য, ধর্ম ও ৬-দফাভিত্তিক স্বায়ত্বশাসন। এসব ইস্যুতে জনমত সংগঠিত করে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত করায় যিনি মূখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও কৌশলি নেতৃত্বে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবদী আন্দোলন ধাপে ধাপে স্বাধীনতার আন্দোলনে পরিণত হয়। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৮ সালে। ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঘোষণা দেন যে, “পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে”। খাজা নাজিমউদ্দিনের এই বক্তব্যে সমগ্র পূর্ববঙ্গে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্ততি গ্রহণের জন্য কর্মতৎপরতা শুরু করেন। তিনি ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২ মার্চ ভাষা প্রশ্নে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমুদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে আহূত সর্বদলীয় সভায় শেখ মুজিবের প্রস্তাবক্রমে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ১১ মার্চ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ হিসেবে সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগই এই আন্দোলনে মূখ্য ভূমিকা পালন করে। ১১ মার্চ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে ঢাকার সচিবালয়ে ১ নম্বর গেটের সামনে বিক্ষোভরত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বেশ কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। শেখ মুজিবসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের গ্রেপ্তারে সমগ্র পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে এখান থেকেই শুরু হয় শেখ মুজিবের গ্রেপ্তার হওয়া ও কারাজীবন। মুসলিম লীগ সরকার আন্দোলনের চাপে ছাত্রদের দাবি মেনে কারাগারে আটক শেখ মুজিবসহ গ্রেপ্তারকৃত ছাত্র নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ৮টি শর্তে সমঝোতা করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। ৫ দিনের কারাবাস শেষে ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ মুজিবসহ ছাত্র নেতৃবৃন্দ মুক্তিলাভ করেন। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্র-জনতার এক সভা আয়োজন করা হয়। সেই সভায় শেখ মুজিব সভাপতিত্ব করেন। সভাশেষে ছাত্রদের শোভাযাত্রা প্রাদেশিক পরিষদ অভিমুখে অগ্রসর হয়। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন পেছনের দরজা দিয়ে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন। ছাত্রদের শোভাযাত্রার উপর পুলিশ হামলা করে। এ হামলার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ঢাকার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলন কেবল সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার আন্দোলন ছিলো না- বাঙালি জাতির আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের প্রক্রিয়ায় তা একসময় হয়ে ওঠে স্বাধীন জাতিসত্তায় উত্তরণের প্রেরণামন্ত্র। ১৯৫২ সালের ২১ থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত প্রায় বিশ বছর ভাষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন চলেছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। বাঙালি যে একটি ঐতিহ্যবাহী জাতি, এ জাতির যে একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে সে কথা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে আমরা জানতে পেরেছিলাম। আর সে জন্যই ‘৫২-র একুশের রক্ত ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯ এবং ’৭১ -এর সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে বাঙালিকে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে বাঙালি জাতির স্বাধীকারের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা পরিপূর্ণতা পায়। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার দাবি যদি উত্থাপিত না হতো, যদি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করতো বাংলার সূর্য সন্তানেরা, তাহলে উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতো। পূর্ববাংলা এমনিতে পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। অবিভক্ত ভারতে বিভিন্ন ভাষাভাষী মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানরাই ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাকিস্তানেও আমরা ছিলাম সংখ্যাগরিষ্ঠ। অথচ পাকিস্তানের প্রথম পঁচিশ বছরের ইতিহাসে সেই বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দিতে এমন কোনো কূটকৌশল ছিলো না যে তারা প্রয়োগ করেনি। কিন্তু ১৯৫২-এর একুশের চেতনায় উজ্জীবিত বাঙালি একের পর এক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২১ থেকে ৭১-এর মধ্যে তার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অধিকারকে রক্ষা করে গেছে। সে জন্যই পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব বাংলায় বাঙালি ‘অ্যাথনিক ক্লিনজিং’ বা গণহত্যা শুরু করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো বাঙালি জাতিকে নির্মূল করা, বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করা। আর সে জন্যই বাঙালিকে ‘৭১-এ হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হয়েছিল।

বাঙালির ললাটে দুটি বিজয়ের গৌরবতিলক অঙ্কিত হয়ে আছে। প্রথম বিজয়তিলক অঙ্কিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে, যখন আমাদের মায়ের ভাষা তথা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার রক্তের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম পাকিস্তানি উপনিবেশিকদের হাত থেকে। সেদিন বীর বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল শাসকচক্রের বিরুদ্ধে এবং রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার গৌরব দান করতে সক্ষম হয়েছিল। বাংলা আজ পৃথিবীর চতুর্থ প্রধান ভাষা এবং সমগ্র বিশ্বে বাঙালিদের অধিবাস, যারা কথা বলে ও স্বপ্ন দেখে বাংলা ভাষাতেই। আমাদের ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনই বীজ বপন করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের; নয় মাসের যে রক্তক্ষয়ী জীবন বাজি রাখা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরে আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অঙ্কিত হলো একটি নতুন দেশ, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ভাষার রাজনৈতিক চরিত্র কত প্রবল, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তার প্রমাণ। ব্যক্তি ও সমষ্টির আত্মসন্ধান ও আত্ম-আবিস্কার কীভাবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানবধর্মী গণতান্ত্রিক চেতনায় পরিণত হয়, ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস তার প্রমাণ।

বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে নির্মিত ওয়েবসাইট এর তথ্য হালনাগাদ চলছে।